পাঁচ লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে রোহিঙ্গা নারী

693

মিয়ানমারে নির্যাতনের মুখে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নারীদের কাজ দেওয়ার কথা বলে দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে বিদেশি দালালের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। গত এক বছরে ২৩ নারীকে তিন দফায় মালয়েশিয়ায় পাচার করেছে একটি চক্র। তাদের প্রত্যেককে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। সর্বশেষ একই চক্রের পাচারের প্রস্তুতিকালে আরও ২৩ নারীকে উদ্ধার করে কক্সবাজারের ক্যাম্পে ফেরত পাঠিয়েছে পুলিশ। পাচারকারী চক্রের চার সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানিয়েছেন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যরা। গতকাল বৃহস্পতিবার ওই চারজনের মধ্যে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পরে চারজনকেই কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। ওই চারজন হলেন আইয়ুব মোস্তাকিম, তার স্ত্রী আসমা, ওয়ালিদ হোসেন কাজল ও তোফাজ্জল হোসেন ভূঁইয়া। পুলিশের ধারণা, আইয়ুব ও আসমা রোহিঙ্গা। ডিবির পশ্চিম বিভাগের উপকমিশনার মোখলেছুর রহমান জানান, গ্রেপ্তারকৃত চার আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে সোপর্দ করা হলে আইয়ুব মোস্তাকিম, ওয়ালিদ হোসেন কাজল ও তোফাজ্জল হোসেন ভূঁইয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে তারা কীভাবে রোহিঙ্গা নারীদের ক্যাম্প থেকে বের করা হতো, ঢাকায় এনে কোথায় রাখা হতো ও পাসপোর্ট সংগ্রহ করে কীভাবে মালয়েশিয়া পাচার করা হতো, সেসব বিষয়ে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

মোখলেছুর আরও জানান, আসামি ওয়ালিদ হোসেন কাজল বলেছেন, আগেও তিন দফায় ২৩ রোহিঙ্গাকে তার বাসায় আটকে রেখে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচার করা হয়েছে। কিন্তু তারা সেখানে নিরাপদে পৌঁছেছে নাকি ট্রলারডুবিতে মারা গেছে, সে বিষয়ে জানেন না বলে জানিয়েছেন।
ডিবির জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা জানান, ভূমধ্যসাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় যেসব বাংলাদেশির মৃত্যু হয়, তাদের মধ্যে কয়েকজন রোহিঙ্গা ছিলেন বলে পাচারকারী চক্রের এক সদস্য জানিয়েছেন। তবে তার দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা সম্ভব হয়নি। ডিবির পশ্চিম বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার আনিসুর রশীদ জানান, রোহিঙ্গা নারী পাচার সিন্ডিকেটের প্রধান হাজি ইব্রাহিম খলিল ও তার সহযোগী আবদুস সবুর ওরফে রহিমকে খোঁজা হচ্ছে। দুজনকে গ্রেপ্তার করতে পারলে এ বিষয়ে আরও তথ্য জানা যাবে।
ডিবির একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী পলাতক আবদুস সবুর ওরফে রহিম, গ্রেপ্তার হওয়া আইয়ুব মোস্তাকিম ও তার স্ত্রী আসমা রোহিঙ্গা। তারা অনেক আগেই বাংলাদেশে এসে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে বসবাস করছেন। এদের সঙ্গে রোহিঙ্গা অনেকের যোগাযোগ রয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় দালাল কানা রফিক ওরফে রফিক ও মফিজ উদ্দিনের সহায়তায় গত বছরে তিন দফায় আরও ২৩ রোহিঙ্গাকে মালয়েশিয়া পাচার করা হয়েছে।

১৯৯৬ সাল থেকে কক্সবাজারে ‘রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি’ নামে একটি সংগঠন সক্রিয়। এই সংগঠনের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক জানান, রোহিঙ্গারা বিভিন্ন কৌশলে ক্যাম্প থেকে বের হয়ে দেশে ও বিদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় দালাল, জনপ্রতিনিধি, ক্যাম্পের মাঝি ও প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তারাও জড়িত। ক্যাম্পের ভেতর সবজি, লবণ, সিলিন্ডার ও মোবাইল ফোন বিক্রেতা সেজে বেশ কিছু দালাল ঢুকে পড়েছে, যারা অনবরত ‘সুন্দরী’ নারীদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে বাইরে বের করে আনে। পাহাড়ে গাছ কাটা কিংবা হোটেলে গৃহকর্মীর কাজের ছুতোয় বাইরে বের করা হয় নারীদের। এরপর আরও ভালো কাজের কথা বলে সেখান থেকে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলা শহরে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আরও জানান, অপরিচিত জায়গায় কিছুদিন আটকে রেখে রোহিঙ্গা নারীদের বিভিন্ন অনৈতিক কাজে বাধ্য করানো হয়। একসময় তাদের বাইরে পাচার করা হয়।
ডিবির এক কর্মকর্তা জানান, সর্বশেষ তাদের হাতে আটক ২৩ রোহিঙ্গা নারীর প্রত্যেকের কাছ থেকে ২০-২৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দালালচক্রের আরও ১৫-২০ হাজার টাকা খরচ হয় তাদের মালয়েশিয়া পর্যন্ত নিয়ে যেতে।

সেখানে যাওয়ার পর প্রত্যেক রোহিঙ্গা নারীকে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ২৩ রোহিঙ্গা নারীকে উদ্ধার ও পাচারকারী চক্রের কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের পর মালিবাগ এলাকার গুলবাগে হাজি ইব্রাহিম খলিলের ৩৯৯/বি নম্বর বাসার চতুর্থ তলায় অভিযান চালিয়ে ৫৬টি পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়। এসব পাসপোর্টে রোহিঙ্গা নারীদের নাম লিখে ভুয়া বাবা-মা ও তাদের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে।
ডিবির উপকমিশনার মোখলেছুর রহমান বলেন, উদ্ধার করা পাসপোর্টগুলো পুলিশের বিশেষ শাখায় পাঠানো হয়েছে। এতগুলো পাসপোর্ট কীভাবে ও কারা সরবরাহ করেছে, সে বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে কক্সবাজার ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দারা মানবেতর ও বন্দি জীবন পার করছে। কাজ ও খাবারের সংকট রয়েছে। তাই মুক্তির জন্য তারা বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়। তার ওপর কিছু বেসরকারি সংস্থার লোকজন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দালালদের লোভনীয় হাতছানির ফাঁদে পড়ে বাইরে পাচার হচ্ছে রোহিঙ্গারা। এ ছাড়া ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। বিশেষ করে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও রংপুরে অনেক রোহিঙ্গা আত্মগোপন করে আছে।’ দেশ রুপান্তর