‘গাধা তোদের পুষে লাভ কী’ বলেই হত্যার নির্দেশ

302

নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার প্রধান আসামি অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। দায় স্বীকার করে তিনি বলেন, কারাগার থেকেই তিনি রাফিকে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দিয়েছেন।
কারাগারে তার সঙ্গে শাহাদাত হোসেন শামীমসহ অনুসারীরা দেখা করতে গেলে সিরাজ বলেন, ‘গাধা তোদের পুষে লাভ কী।’ এরপর তিনি রাফিকে হত্যার নির্দেশ দেন। রোববার বিকালে ফেনীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাকির হোসাইনের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় সিরাজ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে একই আদালতে মো. লোকমান ওরফে লিটন নামের একজন সাক্ষী হিসেবে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। লোকমান সোনাগাজীর ভূঁইয়াবাজারের ব্যবসায়ী। নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়ার জন্য আসামি শাহাদাত হোসেন শামীম ওই দোকান থেকে এক লিটার কেরোসিন কিনেছিল।

পিবিআইয়ের চট্টগ্রাম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ইকবাল জানিয়েছেন, কারাগার থেকেই রাফিকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ সিরাজ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি জানান, এর আগে ৯ এপ্রিল সিরাজকে আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
শনিবার তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র জানায়, অধ্যক্ষ সিরাজ ও অপর আসামি শামীমকে মুখোমুখি করে পিবিআই দু’দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে রাফি হত্যাসংশ্লিষ্ট আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর।
অধ্যক্ষ সিরাজের যৌন হয়রানির ঘটনার পর রাফিকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এ ঘটনায় সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ৩০ এপ্রিল আদালতে জমা দেয়া হবে নাকি আরও সময় চাওয়া হবে সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত হবে আজ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এএসপি রিমা সুলতানা জানান, ওসির জব্দ করা দুটি মোবাইল ফোন সেট ও অন্য সব আলামতের ফরেনসিক রিপোর্ট আজ পাওয়ার কথা রয়েছে। রিপোর্টগুলো পাওয়ার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
এদিকে রাফি হত্যা মামলার তদন্তে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। আর পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেছেন, রাফি হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত ১৬ জনের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। তদন্ত দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। মে মাসের মধ্যেই চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হবে।
রাফি হত্যা মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শনিবার রাতে ও রোববার সকালে দু’দফা অধ্যক্ষ সিরাজ ও শামীমকে মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করে পিবিআই। কারাগার থেকে রাফি হত্যার নির্দেশ দেয়ার বিষয়ে শনিবার রাতে সিরাজকে প্রশ্ন করা হলে তিনি তা অস্বীকার করেন। পরে সিরাজকে শামীমের মুখোমুখি করে পিবিআই।

তখন শামীম জানায়, ‘১ এপ্রিল দেখা করতে গেলে ওস্তাদ আমাদের কাছে জানতে চান তার মুক্তির ব্যাপারে কী করেছি। আমি বলি চেষ্টা করছি। এ সময় তিনি (সিরাজ) ক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের বকা দিয়ে বলেন, ‘গাধার দল আমি অযথাই তোদের পুষেছি। আমার এ বিপদে তোরা কোনো উপকারে আসছিস না।
এরপর তিনি বলেন, এখনও সময় আছে, চিন্তাভাবনা কর। কাউন্সিলর মাকসুদ ও রুহুল আমিনের সঙ্গে দেখা করে কথা বল। দ্রুত একটা সিদ্ধান্ত নে তোরা। এরপর ওস্তাদ আবার ৩ এপ্রিল দেখা করার আদেশ দেন।’ শামীম আরও বলেন, এরপর ৩ এপ্রিল কারাগারে গেলে নুরুদ্দিন, হাফেজ আবদুল কাদের ও তাকে (শামীম) আলাদা ডেকে ওস্তাদ বলেন, অতি তাড়াতাড়ি তোরা ব্যবস্থা নে।
রাফিকে ডেকে মামলা তুলে নেয়ার জন্য চাপ দিবি। রাজি না হলে প্রয়োজনে কাউন্সিলর মাকসুদের সঙ্গে কথা বলে রাফিকে খুন করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিবি। টাকা-পয়সা যা লাগে নিবি। প্রয়োজনে কাউন্সিলর মাকসুদের কাছ থেকে টাকা নিবি।’

এ সময় এ বিষয়ে সিরাজকে পিবিআই কর্মকর্তারা বলেন, শামীম যা বলল এ বিষয়ে আপনার কোনো বক্তব্য আছে কি না। তখন কোনো উত্তর না দিয়ে বিমর্ষ হয়ে বসে থাকেন সিরাজ। এরপর একাধিক প্রশ্ন করা হলেও তিনি কোনো কিছুর জবাব দেননি। রোববার সকালে আবারও দু’জনকে মুখোমুখি করা হয়।
রাফিকে যৌন হয়রানির আগে বিভিন্ন সময়ে অন্য ছাত্রীদের ডেকে যৌন হয়রানি, মাদ্রাসার আয়ের টাকা আত্মসাৎসহ কমপক্ষে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিরাজকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিতে সিরাজ রাজি হন।
শনিবার রাতে সোনাগাজীর চরচান্দিয়া ইউনিয়নের ভূঞাবাজার গ্রামে শামীমকে নিয়ে যায় পিবিআই। পিবিআইয়ের পরিদর্শক শাহ আলম যুগান্তরকে বলেন, শামীমকে নিয়ে তার বসতঘর ও ভূঞাবাজারের দোকানে অভিযান চালিয়ে একটি ল্যাপটপ, একটি মোবাইল ফোন সেট ও বেশ কিছু নথিপত্র জব্দ করা হয়।

হাইকোর্টের সন্তুষ্টি : রাফি হত্যা মামলায় পিবিআইয়ের তদন্তে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। রাফি হত্যার ঘটনায় বিচারিক কমিশন চেয়ে করা এক রিট উপস্থাপনের পর রোববার বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
অশিক্ষিতের স্থান হবে না গভর্নিং বডিতে : রোববার দুপুরে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শনে যান মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর একেএম সাইফ উল্যাহ। এ সময় তিনি বলেন, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী নিপীড়নের প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ ছাড়া ভবিষ্যতে মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটিতে কোনো অশিক্ষিত অযোগ্য লোকের ঠাঁই হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, আমরা ইতিমধ্যে সারা দেশে ৫ সদস্যবিশিষ্ট যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের কাজ শুরু করেছি। সিরাজের মতো এমন চরিত্রহীন শিক্ষকদের ব্যাপারে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। রাফির ওপর বর্বরতার ঘটনায় অধ্যক্ষ সিরাজ ও ইংরেজি শিক্ষক আবছার উদ্দিনের এমপিও স্থগিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, ৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যান নুসরাত জাহান রাফি। কয়েকজন তাকে কৌশলে ছাদে ডেকে নিয়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা শ্লীলতাহানির মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়। অস্বীকৃতি জানালে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।
এ ঘটনায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা, পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান অগ্নিদগ্ধ রাফি।
এর আগে ২৭ মার্চ ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রোববার তাকে আদালতে হাজির করা হয়। এ পর্যন্ত রাফি হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার ২২ জনের মধ্যে সিরাজ উদ্দৌলাসহ ৯ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।