আগুনে দগ্ধ বাচ্চাটার ‘শরীর থেকে খসে পড়ছে চামড়া, ব্যান্ডেজ করেই ছেড়ে দিল হাসপাতাল’

780

শনিবার রাত তিনটে। উল্টোডাঙায় পুলিশ ছাউনি ফিফ্‌থ ব্যাটেলিয়নের সামনের রাস্তায় দগ্ধ শিশু কোলে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছেন এক অগ্নিদগ্ধ যুবক। মুখে আগুন, আগুন চিৎকার। স্থানীয় আত্মীয়দের বাড়িতে ঢুকে তাঁদের ঘুম ভাঙিয়ে কোনওমতে যুবকটি বলেন, ‘‘দাদা আমাদের বাঁচা। আমরা সবাই পুড়ে গিয়েছি!’’ তার পরে আর জ্ঞান ছিল না যুবকের।

তখন থেকে এ ভাবেই বাঁচার লড়াই শুরু হয়েছে ঘুমের মধ্যে অগ্নিদগ্ধ স্বামী-স্ত্রী এবং তাঁদের সাড়ে ছ’মাসের শিশুকন্যার। উদ্ধার করে তাঁদের সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করাতে গিয়ে প্রতিবেশীরা চরম হেনস্থার মুখোমুখি হন। অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালের দোরে দোরে ঘুরে তাঁরা শুনছেন, ‘শয্যা ফাঁকা নেই। বেসরকারি হাসপাতালে যান।’ অভিযোগ, তেমনই একটি বেরকারি হাসপাতাল তাঁদের জানায়, অগ্নিদগ্ধ রোগীর প্রতিদিনের চিকিৎসার খরচ দেড় লক্ষ টাকা। ভর্তির সময়েই দু’লক্ষ টাকা লাগবে। গেঞ্জির কারখানায় সাধারণ কর্মীর পরিবারের পক্ষে ওই টাকার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি।

অবশেষে ওই দম্পতিকে পার্ক সার্কাসের একটি কম খরচের হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন প্রতিবেশীরা। রবিবার সকাল ৮টা নাগাদ শিশুকন্যাটিকে ভর্তি করানো গিয়েছে এসএসকেএম হাসপাতালে। অলোক রায় নামে রোগীর এক আত্মীয় বলেন, ‘‘অনেক কষ্টে ভর্তি করাতে পেরেছি।’’

শনিবার রাত পৌনে ৩টে নাগাদ ফিফ্‌থ ব্যাটেলিয়ন সংলগ্ন বস্তির একটি ঘরে আগুন লাগে। ঘরে কাঠের পাটাতন পেতে মাচা বানানো হয়েছিল। মাচার উপরে স্ত্রী মাম্পি এবং শিশুকন্যা ঈশিকাকে নিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন মধুসূদন রায়। নীচে ছিলেন তাঁর দাদা মানিক। বাকিরা পুড়ে গেলেও মানিক অক্ষত রয়েছেন। প্রতিবেশীদের কয়েক জন ঈশিকাকে নিয়ে প্রথমে বি সি রায় শিশু হাসপাতালে যান। সেখানে তাঁদের জানিয়ে দেওয়া হয়, মা ছাড়া কোনও শিশুকে ভর্তি নেওয়া হয় না। শিশুটির মা-ও অগ্নিদগ্ধ হওয়ার কথা জানিয়েও কোনও লাভ হয়নি বলে অভিযোগ। শিশুটিকে এর পরে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও শয্যা নেই বলে ভর্তি নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। শ্যাম গায়েন নামে এক প্রতিবেশীর কথায়, ‘‘মেয়েটার শরীর থেকে তখন চামড়া খসে খসে পড়ছে। কিছুতেই ভর্তি নিল না! অনেক ঝামেলা করায় একটু ব্যান্ডেজ করে ছেড়ে দিয়েছে।’’

এর পরে শিশুটিকে এন আর এস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও শিশুটিকে জায়গা হয়নি বলে তাকে এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অনেক ‘ঝামেলা’র পরে সেখানে শিশুটিকে ভর্তি করানো গিয়েছে বলে প্রতিবেশীদের দাবি।

এরই মধ্যে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে শিশুটির বাবা-মা’কে নিয়ে যাওয়া হয় কাঁকুড়গাছির একটি বেসরকারি হাসপাতালে। সেখানে মোটা টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ। সকাল সাতটা নাগাদ পার্ক সার্কাসের একটি হাসপাতালে তাঁদের ভর্তি করানো হয়। হাসপাতাল জানিয়েছে, মাম্পির ৪০ শতাংশ এবং মধুসূদনের ৭০ শতাংশ অগ্নিদগ্ধ। তবে শিশুটির শরীরের ৮০ শতাংশই পুড়ে গিয়েছে। রাতের দিকে তাঁদের এসএসকেএমে নিয়ে আসা হয়।

জরুরি সময়ে বি সি রায় হাসপাতাল শিশুটিকে ভর্তি নিল না কেন?

অধ্যক্ষ মালা ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘মা সঙ্গে না থাকলে আমরা কাউকে ভর্তি নিই না। পাড়ার লোককে রেখে ভর্তি নিলে পরে পরিবার আমাদের দোষ দিতে পারে।’’ শিশুর মা-ও অগ্নিদগ্ধ জানার পরেও না? মালাদেবীর বক্তব্য, ‘‘এটা কাল্পনিক গল্প। পরিবারের কেউ তো থাকবে!’’ ঈশিকার দাদু-ঠাকুমা। ঘটনার রাতে তাঁরা দক্ষিণ ২৪ পরগনার লক্ষ্মীকান্তপুরে ছিলেন।

পোড়া রোগী ফিরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ শুনে আর জি কর এবং এন আর এস হাসপাতালের সুপার যথাক্রমে মানস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সৌরভ চট্টোপাধ্যায় দু’জনেই বলেন, ‘‘খোঁজ নিয়ে দেখব।’’

বারবার ফোন করা হলেও ফোন ধরেননি স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিকর্তা প্রদীপ মিত্র। তবে রাজ্যের স্বাস্থ্য অধিকর্তা অজয় চক্রবর্তী বলছেন, ‘‘সমস্যাটির সমাধান সত্যিই ভেবে বার করতে হবে। পোড়া বাচ্চাকে কোনও ভাবেই ফেরানো যাবে না।’’ স্বাস্থ্য কর্তারা যা-ই বলুন, অনেকের অভিযোগ, বারবার একই ঘটনা ঘটলেও স্বাস্থ্য দফতরের হুঁশ ফেরে না। গত ৮ মার্চে-ই একটি পরিবারকে তাদের অগ্নিদগ্ধ শিশুকন্যাকে নিয়ে সাতটি হাসপাতালে ছুটে বেড়াতে হয়েছিল। তাঁদের বক্তব্য ছিল, ‘‘আরও আগে চিকিৎসা শুরু করলে হয়তো মেয়েটা আমাদের বেঁচে যেত।’’ আর জি কর হাসপাতালে চার দিন ভর্তি থাকার পরে মৃত্যু হয় দিয়া দাস নামে সেই শিশুকন্যার।

ঈশিকার প্রতিবেশীরাও বলছেন, ‘‘আরও আগে কেন চিকিৎসা শুরু হল না!’’
সূত্র: আনন্দবাজার