মৃত্যুর আগে বাবাকে শেষ ‘টেক্সট’ করেন তমাল

525

সকালেও দেখা হয়েছে। আগুনের ঘটনা শুনেই ছেলেকে ফোন দিলাম, ছেলে কথা বললো না। ফোন কেটে দিল। তারপর এসএমএস করে বললো, ‘বাবা, নো স্কোপ’।

আমি ব্যর্থ বাবা, আমার ছেলেকে আমি স্কোপ তৈরি করে দিতে পারিনি। ছেলেটা স্কোপ না পেয়েই মারা গেল। আমাকে জানালো, অথচ আমি কিছু করতে পারলাম না—কান্নাজড়িত কণ্ঠে ছেলে তমালকে হারানোর কথা এভাবেই বলছিলেন বাবা মকবুল আহমেদ।

বনানীর এফআর টাওয়ারের ১১তলায় শ্রীলংকান প্রতিষ্ঠান ইইউআর সার্ভিস বিডি লিমিটেডের সেলস ম্যানেজার ছিলেন আব্দুল্লাহ আল ফারুক তমাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্টে বিবিএ ও এমবিএ শেষ করে চার বছর আগে এখানে কাজে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (২৮ মার্চ) অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত হয়েছেন তমাল। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৯ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

নিহত তমালের খোঁজে তার বাবা-ভাই-বন্ধুরা ঢাকা মেডিকেলে এলে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি তৈরি হয়। তমালের বাবা মকবুল আহমেদ ঢাকা মেডিকেলে আসেন সন্ধ্যা ৬টা ৪১ মিনিটের দিকে। সঙ্গে আসেন তমালের ছোট ভাই তুষার। তার আগে থেকেই বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ছিলেন তমালের বড় ভাই তুহিন।

বাবা মকবুল আহমেদ বলেন, ‘আমার ছেলেটা স্কোপ না পেয়ে মারা গেল। আমাকে জানালো, অথচ আমি কিছু করতে পারলাম না, ও আল্লাহ…! আগুন লাগার পর কথা হয়েছিল একবার। তখন বলেছিল, আমরা আটকে পরেছি, ধোঁয়াতে চারদিক ভরে গেছে, রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকে রেখে রেখেছি। ওকে বললাম, ছাদে চলে যাও। ছেলে বলে, কিছু দেখা যায় না, সব অন্ধকার-এই ছিল সর্বশেষ কথা ছেলের সঙ্গে।’

তমালের মামাতো ভাই আহসান উল্লাহ বলেন, ‘গত মঙ্গলবারেও আমাদের পারিবারিক এক অনুষ্ঠানে আমরা একসঙ্গে ছিলাম, একদিন পর সেই ভাইটা নাই হয়ে গেল।’

ভাইকে হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছেন বড় ভাই তুহিন। তমালের বন্ধুরা একটু পরপরই কেঁদে উঠছিলেন একজন আরেকজনকে জড়িয়ে। তাদের একজন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি ডিরেক্টর গোলাম সারোয়ার জানান, তারা একসঙ্গেই নটরডেম আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। সারোয়ার জানান, তমালদের বাড়ি চাঁদপুরে, তবে ঢাকায় ডেমরাতে থাকতেন। তমালরা তিনভাই, তুহিন-তমাল আর তুষার। বড়ভাই তুহিন ইংল্যান্ডে থাকতেন কিন্তু কয়েকমাস আগে দেশে ফিরে এসেছেন।

হাসপাতালে এলেও তুহিন বিকাল থেকেও জানতেন না ভাই নেই। তাকে বলা হয়েছিল, তমালের চিকিৎসা চলছে, চিকিৎসকরা সেখানে কাউকে ঢুকতে দিচ্ছেন না। কিন্তু ভাইয়ের মন বলে কথা। তাই বারবার বলছিলেন, ‘ও আমার ভাইরে, আমারে কোন সাগরে তুই রেখে গেলিরে ভাই।’ কারও উদ্দেশে বারবার পাগলের মতো তিনি বলছিলেন, ‘টাকার দিকে তাকাবি না, আমার ভাইরে বাঁচায়ে আন।’

গোলাম সারোয়ার জানান, ২০১৩ সালে বিয়ে করেন আব্দুল্লাহ আল ফারুক তমাল। স্ত্রী সানজিদাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জানানো হয়নি মৃত্যুর খবর। জানেন না মা’ও। তমালের রয়েছে মানহা নামে প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া বড় মেয়ে আর আইমান নামের পাঁচ বছরের এক ছেলে।

সারোয়ার নিজের মোবাইল থেকে ছবি বের করে বলন, ‘গত শুক্রবারে আমার বিয়ের ছবি এটা। আমরা একসঙ্গে স্কুল-কলেজে পড়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে সবকিছুতে সে জড়িত থাকতো। সব বন্ধুরা ছুটে এসেছি, প্রিয়জন হারালে কেমন লাগে, সেটা আমরা বন্ধুরা এখন বুঝতে পারছি।’

এর আগে, তমালকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নিয়ে আসা হয়। সেখানের কর্তব্যরত চিকিৎসক মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন বলেন, ‘তাকে যখন প্রথম নিয়ে আসা হয়, তিনি মৃত না জীবিত প্রথমে বুঝতে পারিনি। তার শরীরের ৯০ শতাংশ পুড়ে গেছে। তিনি জীবিত কি না, তা বোঝার জন্য তাকে সিপিআর (কার্ডিও পালমোনারি রিসাসিটেশন) দেওয়া হয়। এরপরও বোঝা গেলো না তার অবস্থা। এরপর তার চোখ দেখলাম। দেখলাম তার চোখ ছোট। এরপর আবারও সিপিআর দেই। বেশ কয়েকবার সিপিআর দেওয়ার পরই তাকে মৃত ঘোষণা করি।’