প্রথম বারের মতন পাকিস্তানে উদযাপিত হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস #২৬শে মার্চ

3695

যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ৪৯তম স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপিত হলো পাকিস্তানে। করাচিতে অবস্থিত বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মঙ্গলবার ডেপুটি হাইকমিশনের এক বিবৃতিতে বলা হয়, কমিশনের চ্যান্সেরিতে ডেপুটি হাইকমিশনারের বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। স্বাধীনতা দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রবাসী বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের সদস্যরাও যোগ দেন। পতাকা উত্তোলনের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতার নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলে মিলে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পাঠানো বার্তা পড়ে শোনানো হয়। ডেপুটি হাইকমিশনার নূর-ই হেলাল সাইফুর রহমান বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্ন পূরণে প্রবাসীদের একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জন করে বাংলাদেশ। গণহত্যার জন্য জাতিসংঘের স্বীকৃতি অর্জনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ তাদের প্রচেষ্টাকে আরো জোরদার করেছে।

### যুদ্ধের সময় অনেকবার শত্রুর নিশানায় পড়েছিলামবীর মুক্তিযোদ্ধা, অভিনেতা ও সংসদ সদস্য আকবর হোসেন পাঠান ফারুক। ছাত্রলীগ করার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে অভিষেক হয় তার। দেশ স্বাধীনের আগে থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় এ অভিনেতা। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। চিত্রনায়ক হিসেবেও বেশ প্রশংসিত। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও সমসাময়িক প্রসঙ্গ নিয়ে আজকের ‘হ্যালো…’ বিভাগে কথা বলেছেন তিনি।

* যুগান্তর: ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে আপনার অবস্থান কী ছিল? ** ফারুক: সে দিন রাজধানীর শ্যামলীতে নিজেদের বাড়িতেই ছিলাম। দুপুরের খাবারও বাড়িতেই খেয়েছি। এরপর দুই বন্ধু সামসু ও নাদের এসে আমাকে ডাকল। তারা যে গাড়িতে এসেছিল, সে গাড়ির পেছনে ছিল অস্ত্রে ভরা। এই অস্ত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেও তারা বলল, আজ রাতে একটা পরিবর্তন আসবে দেশে, তার প্রস্তুতি হিসেবে এগুলো আনা হয়েছে। আমাকে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে গিয়ে আরও বিস্তারিত জানার পরামর্শ দিয়ে ওরা চলে যায়। ওদের এসব কথা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এর আগেই আমি একটি ছবির নায়কও হয়েছিলাম। যাই হোক, বাসায় জানিয়ে আমি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি লোকে লোকারণ্য। বঙ্গবন্ধু আমাদের যার যার জায়গা অনুযায়ী চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। সন্ধ্যায় সেখান থেকে পুরান ঢাকার প্যারামাউন্ট হোটেলে গিয়ে উঠি। ওখানে বসে আড্ডা দিচ্ছি। এমন সময় এক পুলিশ অফিসার এসে সবাইকে আর্মি আসার কথা বলে সাবধান করে চলে যায়। এ কথা শোনার পর আমি নিশ্চিত হয়ে যাই রাতেই কিছু একটা ঘটবে। সেখান থেকে নবাবপুর রোডে এসে দাঁড়াই। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কিছু মানুষকে উদ্দেশ্য করে আমি বক্তব্য দেয়া শুরু করি। রাত ১২টা বাজতে অল্প সময় বাকি তখন। ওখানেই রাস্তার পাশে পুরনো একটা গাড়ি দিয়ে ব্যারিকেড দিই কয়েকজনের সহযোগিতায়। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনকার মতো এত সহজ ছিল না। ঢাকা শহরের অন্যান্য এলাকার খবর সেই রাতে না জানলেও নবাবপুর রোডে পাক আর্মিদের প্রতিরোধের জন্য রাস্তায় প্রথম ব্যারিকেড আমিই দিয়েছিলাম। এরপর একটা সাংকেতিক মেসেজ আসার পর ওই এলাকা থেকে চলে যাই কাছাকাছি একটা বাড়িতে। সেখানে গিয়ে দেখি অস্ত্র মজুত করে রাখা আছে। বন্ধু নাদেরসহ আমরা ১৮ জন সেই বাসায় বৈঠক করি। সেখান থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে আমাদের কাজ শুরু করে দেই।

* যুগান্তর: মুক্তিযুদ্ধে কীভাবে যোগ দিয়েছেন? ** ফারুক: তখন যোগ দেয়ার কোনো বিষয় ছিল না। আমরা আগে থেকেই একটা টিম ছিলাম। বঙ্গবন্ধু যখন আমাদের গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, তোরা এখন দেশের জন্য কিছু কর। এর থেকে বড় কিছু তো আর হতে পারে না। * যুগান্তর: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন দিনগুলো কেমন ছিল?
** ফারুক: সেই সময় কোনো কিছুই মনে থাকত না যুদ্ধ ছাড়া। বিশেষ করে খাওয়া-দাওয়াও। বলাই যেত না কখন কোথায় গিয়ে খেতে পারব। কখন ঘুমাব তাও কেউ বলতে পারত না। গেরিলা যুদ্ধে কেউ এসব বলতে পারবে না। আমার অনেক সহযোদ্ধাকে ক্ষুধা নিবারণের জন্য গাছের পাতা খেতেও দেখেছি। আমরা এক জায়গায় কখনও বেশি সময় থাকিনি। অবস্থান বদল করে চলার পরও যুদ্ধের সময় অনেকবার শত্রুর নিশানায় পড়েছিলাম। আল্লাহর অশেষ রহমতে সেসব বিপদ থেকে বেঁচে যাই তখন। খোলা রাস্তায় আমাদের বের হওয়া খুব কঠিন ছিল। অভিনয়ের জন্য আমাকে অনেক লোক চিনত তখন। সে জন্য দেশপ্রেমিক বহু মানুষের সহায়তা পেয়েছি।

* যুগান্তর: মুক্তিযুদ্ধের সময় কেমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন?
** ফারুক: তখন আমাদের অন্য কোনো ফিলিং ছিল না। ফিলিং ছিল একটাই, আর তা হল বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু যে বাংলাদেশ চান, যেই স্বাধীনতা চান, সেই স্বাধীনতা চাই। বঙ্গবন্ধুর কথা তো একটাই ছিল, বাংলাদেশের মাটিকে স্বাধীন করতে হবে। একটা দেশ হতে পারে, একটা জাতি হতে পারে, যদি একটা জেনারেশন সেক্রিফাইস করতে পারে। আমাদের মাটির জন্য জীবন দেয়ার পণ করে কাজ যারা করেছে তারাই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান।
* যুগান্তর: যে চেতনা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হল, সেই চেতনা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে? ** ফারুক: মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত অনেক সংগঠক আজ বেঁচে নেই। একটা অর্জন এবং এ দেশের মানুষ কি চায় এই কথাগুলো বঙ্গবন্ধু বলেছেন। ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু যা বলে গেছেন, আমরা সেটাই অনুসরণ করতাম। অধিকার এবং সোনার বাংলার কথা তিনি যুদ্ধ পরবর্তী দেশে ফিরে বলেছেন। দেশ গড়ার শুরুর সময়টাতেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি সেভাবে দেশ গড়তে পারেননি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আমাদের নিয়ে দেশ গড়তে চান। এ দেশের মানুষ নিয়ে সবাইকে নিয়ে এ দেশটাকে গড়তে চান। বঙ্গবন্ধুর চোখ দিয়ে দেখেন পুরো দেশটাকে।