ক্ষুদ্রতম দ্বীপ নিয়ে দুই দেশের লড়াই.

1946

একটি ফুটবল খেলার মাঠের জন্য যতটুকু জায়গা দরকার মিগিংগো দ্বীপটির আয়তন তার অর্ধেক। বসতি আছে বিশ্বের এমন দ্বীপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ছোট। এই দ্বীপ নিয়েই দ্বন্দ্ব চলছে প্রতিবেশী কেনিয়া ও উগান্ডার মধ্যে। দুই দেশের মানুষেরই বসবাস এই দ্বীপে। কিন্তু কী আছে এই দ্বীপে আর কেনই বা এই দ্বন্দ্ব?কেনিয়া ও উগান্ডার সীমান্তে অবস্থিত এই দ্বীপের আয়তন দুই হাজার বর্গফুট। আফ্রিকা মহাদেশের লেক ভিক্টোরিয়ায় অবস্থিত এই দ্বীপটির লোকসংখ্যা পাঁচ শতাধিক। অধিকাংশের পেশা মাছ ধরা। শিকার করা মাছের ৮০ ভাগ পায় নৌকার মালিক আর ২০ ভাগ পায় জেলেরা। অধিকাংশ জেলের নিজস্ব নৌকা নেই। আবার মাছ লুটের অভিযোগও আছে। তাই জেলেদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না কখনো। বাসিন্দাদের সবাই নি¤œবিত্ত। তাই তাদের বাস ছোট ছোট বস্তিঘরে।

পাথরের এই দ্বীপে একটি ছোট বন্দর, কিছু বার, একটি পতিতালয়, একটি ওপেন এয়ার কেসিনো বা জুয়ার আসর রয়েছে। এই কেসিনোতে জেলারা তাদের ভাগ্য যাচাইয়ের চেষ্টা করে। রয়েছে মোবাইল ফোন চার্জ দেয়ার জন্য একটি দোকান। যেখানে সেলুনের কাজও করা হয়। আছে একটি ছোট ক্লিনিক। যেখানে ম্যালেরিয়াসহ ছোটখাটো রোগের চিকিৎসা করেন একজন নার্স। দ্বীপের মহিলা বাসিন্দারা তাদের স্বামীদের কিংবা ছোট খাবারের দোকানে রান্নাবান্নায় সহায়তা করে। কেনিয়ার মূল ভূমি থেকে দ্বীপটিতে যেতে সময় লাগে দুই ঘণ্টা। কিন্তু উগান্ডা থেকে লাগে প্রায় ১৮ ঘণ্টা। এ কারণে কেনিয়ার জেলেরা সপ্তাহ শেষে তাদের বাড়িতে যায়। আর উগান্ডার জেলেরা যায় বছরে এক বা দুই বার। দ্বীপটিকে কেনিয়ার নিজেদের দাবি করার একটি বড় কারণ ভৌগোলিক দূরত্ব। কিন্তু এটাই আসল কারণ নয়। কেনিয়ার অধিবাসীরা দ্বীপটির মালিকানার জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার দাবি জানিয়েছে সরকারের কাছে।ইনস্টিটিউট ফর সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রিটোরিয়া অফিসের একজন সিনিয়র গবেষক ইমানুয়েল কিসিয়ানগিনির মতে, ১৯৯০ দশকের শুরুতে হ্রদটিতে পানি কমার আগে মিগিংগো দ্বীপটি একটি পাথরের চেয়ে সামান্য বেশি আয়তনের ছিল।

এক সময় অতিরিক্ত কচুরিপানার ফলে ভিক্টোরিয়া হ্রদে চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং বন্দরে প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে মাছ ধরা কমে আসে। তবে ক্রমবর্ধমান লাভজনক প্রজাতি যেমন নীল পারচ মাছ মিগিংগো দ্বীপের কাছাকাছি গভীর পানিতে ব্যাপকভাবে পাওয়া যাওয়ায় দ্বীপটি মাছ ধরার কেন্দ্রে পরিণত হয়। উগান্ডা ২০০৪ সালে দ্বীপটিতে সশস্ত্র পুলিশ ও নৌ-সেনা পাঠাতে শুরু করে। তারা জেলেদের দস্যুদের হাত থেকে সুরক্ষা দিতে ট্যাক্স আদায় শুরু করে। কিন্তু কেনিয়ার জেলেরা অভিযোগ করে উগান্ডার পানিতে মাছ ধরার অভিযোগে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। তাদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে যাতে তারা মাছ ধরতে হ্রদে না যায়। এর প্রতিক্রিয়ায় কেনিয়া সরকার মিগিংগো দ্বীপে নৌ-সেনা মোতায়েন করে। এতে দুটি দেশের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মাছের নৌকার মালিকানা চলে যায় দেশ দু’টির সশস্ত্র বাহিনীর অধীনে। জেলেরা যে অংশ পায় তাতেও ভাগ বসায় দুই দেশের বাহিনী। কেনিয়ার সেনারা উগান্ডার জেলেদের আর উগান্ডার সেনারা কেনিয়ার জেলেদের মাছ ছিনিয়ে নেয়।যেভাবে লড়াই চলছেবিশ্বের সবচেয়ে ছোট দ্বীপ। তাই যুদ্ধটাও ছোট। ১৯২০ সালের মানচিত্র অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণের জন্য ২০১৬ সালে উগান্ডা ও কেনিয়া একটি কমিটি গঠন করে। কিন্তু কমিটি কাজের কাজ কিছুই করতে পারেনি। উভয় দেশ দ্বীপটির ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কেনিয়ার নৌ-সেনারা দ্বীপে পতাকা উড়ালে দ্বীপটিতে উগান্ডার অধিবাসীরা সেটি নামিয়ে ফেলে।আবার উগান্ডার নৌ-সেনারা পতাকা উড়ালে কেনিয়ার অধিবাসীরা নামিয়ে ফেলে। এ নিয়ে দ্বীপের জেলেরা প্রায়ই জ্বলে উঠে। তারা এটাকে বলে ‘সবচেয়ে ছোট যুদ্ধ’। উগান্ডার জেলে এডিসন ওমা বলেন, ‘তারা এই দ্বীপটির মালিক কে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেননি।’ তিনি দাবি করেন, ‘এটি নো ম্যানস ল্যান্ড’। যে মাছের কারণে এই দ্বীপের এত মূল্য সেই নীল পারচ মাছ রফতানি হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে। ব্যাপক চাহিদা সেখানে। নতুন করে চাহিদা তৈরি হয়েছে এশিয়াতেও। দেশগুলোতে মিগিংগো পরিচিত নীল পারচ মাছের সাঁতারের থলি হিসেবে। বলা হয় মিগিংগোতে নীল পারচ চাষ হয়। ফলে দেশগুলোতে মিগিংগোর মাছের চাহিদা ও দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে থাকে। কেনিয়ার জেলে কেনেডি ওচিয়েঙের মতে, গত পাঁচ বছরে নীল পারচের দাম ৫০ শতাংশ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বড় আকারের একটি নীল পারচের কেজি ৩০০ মার্কিন ডলার।